ঢাকা ০২:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কে ২০টি অন্ধ বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদ দেড় বছরে নিহত ৫০

মো: ইলিয়াস চৌধুরী, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি :
  • আপডেট ০৬:০৮:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 52

 

দুই পাশে ঘন গজারি ও শালবনের মনোরম পরিবেশ। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা কালো পিচের সড়ক। দেখতে সুন্দর হলেও গাজীপুরের কালিয়াকৈর-মাওনা ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক সড়কটি এখন স্থানীয় ও পথচারীদের কাছে পরিণত হয়েছে ‘মৃত্যুর উপত্যকায়’। সড়কের প্রতি মোড়ে মোড়ে যেন ওঁৎ পেতে রয়েছে মৃত্যুফাঁদ। গত দেড় বছরে এই সড়কে শতাধিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন ১০ জনেরও বেশি মানুষ। প্রতি মাসেই এই সড়ক থেকে আসছে লাশের খবর।

সর্বশেষ গত শনিবার সকালে কাঞ্চনপুর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকার একটি ভয়াবহ অন্ধ বাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ ৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ফুলবাড়িয়া এলাকার গৃহবধূ রোজিনা আক্তার (৩৫) ও তার আট বছরের শিশুসন্তান রাফি।

সরেজমিনে জানা যায়, ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে অন্তত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ অন্ধ বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকে সামনের দিক থেকে আসা যানবাহন সহজে চোখে পড়ে না। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের অনিয়ন্ত্রিত ঝোপঝাড় ও পর্যাপ্ত আলোর অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের ঝোপঝাড় কাটা এবং দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত করা না হলে এই মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামবে না।”

একই সুর গাড়িচালকদের কণ্ঠেও। নিয়মিত চলাচলকারী চালক জামাল হোসেন বলেন, “আমরা প্রায় প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে গাড়ি চালাই। বাঁকগুলোতে সামনের কিছুই দেখা যায় না, ফলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটছে।”

সড়কের কাঠামোগত ত্রুটির কথা স্বীকার করে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রতি দুই-তিন সপ্তাহ পরপরই আমাদের এই সড়ক থেকে দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ উদ্ধার করতে হচ্ছে। মূলত সড়কের কাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে দুর্ঘটনা থামছে না। দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত ও আলোকিত করার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য (গাজীপুর-১) মোঃ মজিবুর রহমান বলেন, “সড়কটি বর্তমানে মারাত্মক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এটি ৪ লেনে সম্প্রসারণের জন্য ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও (DO) লেটার জমা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সবকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে রিফ্লেক্টর ও লাইট বসানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়কটিকে নিরাপদ না করা পর্যন্ত আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ জানান, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো দ্রুত সংস্কারের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।

এদিকে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, দুপাশের ঝোপঝাড় ছাঁটাই এবং থ্রি-হুইলার বা সিএনজি চলাচল নিয়ন্ত্রণের জোর সুপারিশ করেছেন। তবে সার্বিক পরিস্থিতির বাস্তব অগ্রগতি না দেখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর একই প্রশ্ন—আর কত প্রাণ গেলে প্রশস্ত হবে এই কালিয়াকৈর-মাওনা সড়ক?

ট্যাগ

Please Share This Post in Your Social Media

কালিয়াকৈর-মাওনা সড়কে ২০টি অন্ধ বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদ দেড় বছরে নিহত ৫০

আপডেট ০৬:০৮:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

দুই পাশে ঘন গজারি ও শালবনের মনোরম পরিবেশ। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা কালো পিচের সড়ক। দেখতে সুন্দর হলেও গাজীপুরের কালিয়াকৈর-মাওনা ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক সড়কটি এখন স্থানীয় ও পথচারীদের কাছে পরিণত হয়েছে ‘মৃত্যুর উপত্যকায়’। সড়কের প্রতি মোড়ে মোড়ে যেন ওঁৎ পেতে রয়েছে মৃত্যুফাঁদ। গত দেড় বছরে এই সড়কে শতাধিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন ১০ জনেরও বেশি মানুষ। প্রতি মাসেই এই সড়ক থেকে আসছে লাশের খবর।

সর্বশেষ গত শনিবার সকালে কাঞ্চনপুর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকার একটি ভয়াবহ অন্ধ বাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ ৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ফুলবাড়িয়া এলাকার গৃহবধূ রোজিনা আক্তার (৩৫) ও তার আট বছরের শিশুসন্তান রাফি।

সরেজমিনে জানা যায়, ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে অন্তত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ অন্ধ বাঁক রয়েছে। এসব বাঁকে সামনের দিক থেকে আসা যানবাহন সহজে চোখে পড়ে না। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের অনিয়ন্ত্রিত ঝোপঝাড় ও পর্যাপ্ত আলোর অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সোলেমান হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের ঝোপঝাড় কাটা এবং দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত করা না হলে এই মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামবে না।”

একই সুর গাড়িচালকদের কণ্ঠেও। নিয়মিত চলাচলকারী চালক জামাল হোসেন বলেন, “আমরা প্রায় প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে গাড়ি চালাই। বাঁকগুলোতে সামনের কিছুই দেখা যায় না, ফলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটছে।”

সড়কের কাঠামোগত ত্রুটির কথা স্বীকার করে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রতি দুই-তিন সপ্তাহ পরপরই আমাদের এই সড়ক থেকে দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ উদ্ধার করতে হচ্ছে। মূলত সড়কের কাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে দুর্ঘটনা থামছে না। দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত ও আলোকিত করার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য (গাজীপুর-১) মোঃ মজিবুর রহমান বলেন, “সড়কটি বর্তমানে মারাত্মক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এটি ৪ লেনে সম্প্রসারণের জন্য ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও (DO) লেটার জমা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সবকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে রিফ্লেক্টর ও লাইট বসানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়কটিকে নিরাপদ না করা পর্যন্ত আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ জানান, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো দ্রুত সংস্কারের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।

এদিকে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, দুপাশের ঝোপঝাড় ছাঁটাই এবং থ্রি-হুইলার বা সিএনজি চলাচল নিয়ন্ত্রণের জোর সুপারিশ করেছেন। তবে সার্বিক পরিস্থিতির বাস্তব অগ্রগতি না দেখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর একই প্রশ্ন—আর কত প্রাণ গেলে প্রশস্ত হবে এই কালিয়াকৈর-মাওনা সড়ক?