উত্তাল যমুনার বুকে বাতাসের সুতো ধরে ভেসে চলেছে রং-বেরঙের পালতোলা নৌকা। একসময় যান্ত্রিক ইঞ্জিনের গর্জনে রূপসী বাংলার নদী থেকে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য আবার দেখা মিলছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি যমুনায় নদীতে ।
শরতের শুরু থেকেই যমুনায় বইছে ঝিরিঝিরি হাওয়া। ভোরের আলো ফুটতেই নদীর শান্ত জলে যখন রঙিন পালের ছায়া পড়ে, মনে হয় যেন সুদূর সীমানা থেকে ডানা মেলে উড়ে আসছে বড় কোনো পাখি। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ান গ্রামের প্রবীণরা মুহূর্তে ফিরে যান ফেলে আসা দুরন্ত শৈশবে। তবে এই দৃশ্য কেবল নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে না,বর্তমানের চড়া বাজারের জ্বালানি তেলের খরচের ওপরও টান মারছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের পর শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকার দাপটে বজরা,পানসি বা ময়ূরপঙ্খীর মতো পালতোলা নৌকাগুলো আড়ালে চলে যায়। কিন্তু বর্তমানে বাজারে তেলের চড়া দামের কারণে নৌকার মাঝিরা আবারও ফেরাচ্ছেন পুরনো এই পদ্ধতি। ইঞ্জিন ছাড়া কেবল বাতাসের শক্তিতে নৌকা চালিয়ে সরাসরি বেঁচে যাচ্ছে জ্বালানি খরচ। প্রধানত গৃহপালিত পশুর জন্য চর থেকে ঘাস আনা এবং হালকা মালামাল পরিবহনে স্থানীয়রা এখন এই পালতোলা নৌকার ওপর নির্ভর করছেন।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা ধলু ফকির বলেন,আমাদের শৈশব-যৌবনে যমুনায় সারি সারি পালতোলা নৌকা দেখা যেত। তেলের দাম বাড়ায় আমি আবার পাল তুলেছি। প্রতিদিন সকালে এই নৌকায় চরে যাই গবাদিপশুর ঘাস কাটতে। এতে এক ফোঁটা তেলও লাগছে না, টাকাও সাশ্রয় হচ্ছে। একই সাথে শৈশবের নানা স্মৃতি মনে ভেসে উঠছে। আয়তন ও ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে পালতোলা নৌকা মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে,এই পালের নৌকায় তিনটি বাঁশ ব্যবহৃত হয়। মাঝখানে মূল মাস্তুল এবং বাকি দুটি বাঁশ দিয়ে পালের কাপড় শক্ত করে টানা দেওয়া হয়। এতে সাধারণত দুটি বাঁশ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়।
মাস্তুলের সাথে টাঙানো মোটা কাপড়ে বাতাস বাধা পেয়ে তৈরি করে একধরনের চাপ, যা নৌকাকে ভাসিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যায়। মাঝি একটি শক্ত দড়ির মাধ্যমে বাতাস নিয়ন্ত্রণ করে গতি ও দিক ঠিক রাখেন। যমুনার বুকে হঠাৎ ভেসে ওঠা ঐতিহ্যবাহী এই রূপ শুধু প্রবীণদেরই নয়, মন কাড়ছে সারিয়াকান্দিতে আসা পর্যটকদেরও। আধুনিকতার ভিড়ে অর্থ সাশ্রয় আর পরিবেশবান্ধব যাত্রার এই চেষ্টা যমুনাপাড়ের মানুষকে দিচ্ছে নস্টালজিয়া আর স্বস্তির ছোঁয়া।