“একবার ভাবুন ‘জনকণ্ঠ’ পত্রিকার কথা। কতটা প্রভাবশালী আর দাপুটে ছিল। অথচ আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এ প্রজন্মের অনেকে নামও জানে না...”। এক আড্ডায় এভাবেই বলছিলেন তরুণ এক সম্পাদক- প্রকাশক। আরও বললেন, “ভাবতে পারেন ‘দিনকাল’-এর কথা?সম্পাদক-প্রকাশক সরকারের শীর্ষপদে। তারপরও বাজারে প্রভাব কোথায়?ঠিক একইভাবে ‘নয়াদিগন্ত’ও যেন হারিয়ে গেছে। আলোচনাতেও আর নেই। ”
তরুণ সেই প্রকাশকের মন্তব্য, “ন্যারেটিভ উৎপাদনকারী মিডিয়াকে পাঠক আর নিচ্ছে না। কোন মিডিয়া কোন দল বা মতের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করছে, তা পাঠকের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ফলে দলীয় ন্যারেটিভ উৎপাদনকারী পত্রিকাগুলো পাঠক ও ব্যবসা দুটোই হারাচ্ছে।”
সত্যিই তাই। ঐতিহ্যবাহী ‘ভোরের কাগজ’ প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনা বন্ধ করে সম্প্রতি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। অথচ দেশের শীর্ষ সম্পাদকদের হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। শেষ দিকে বিশেষ দল আর মতের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করতে গিয়েই কি তবে হারিয়ে গেল?
এক সময়ের ব্যাপক প্রভাবশালী ইত্তেফাকের মেরুদণ্ডও যেন ক্ষয়ে গেছে। সাহসী, হৈচৈ ফেলা কোনো প্রতিবেদন নেই। যে সরকার আসে তার পক্ষেই সম্মতি উৎপাদন করতে থাকে। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ‘সংবাদ’ও নিভে নিভে জ্বলছে। সমালোচকদের ভাষ্য, বামধারার পত্রিকাটি ঐতিহ্যের মোহে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় নতুন প্রজন্মকে ধরতে চেষ্টা করেনি। ফলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় ভীষণ ক্লান্ত।
সিপিবির ‘গণশক্তি’ও একেবারেই শক্তিহীন। জাপার ‘জনতা’র ভাগ্যে জনতা জুটছে না। সময়ের দাবি পূরণ করতে না পারলে যে ঐতিহ্যও তার বড় ‘ব্র্যান্ডভ্যালু’ হারায়, তার বড় দৃষ্টান্ত ‘দৈনিক বাংলা’। ঐতিহ্যে ভর করে প্রবল দাপটে এসে কোটি কোটি টাকা জলে ফেলে পর্দার আড়ালে চলে গেছে। সম্পাদকদের সম্পাদক খ্যাত নাঈমুল ইসলাম খানের ‘আমাদের নতুন সময়’, ‘আমাদের অর্থনীতি’, ‘আওয়ার টাইম’ও আর নেই।
এটাও সত্য যে, চরিত্র ঠিকঠাক না থাকলে করপোরেট মেগাবাজেটের মিডিয়াও পাঠকের কাছে আবেদন হারাতে পারে। দেশে এমনি কিছু মিডিয়া রং বদলের খেলায় জড়িয়ে পাঠককে প্রতিদিন বিভ্রান্ত করছে। যাদের ব্যবস্থাপনাতেও ব্যাপক গলদ। কখন কাকে ‘ট্যাগ’ দিয়ে যে ছাঁটাই করা হবে তা অনিশ্চিত।
সম্প্রতি বড় বাজেটের পত্রিকার আকস্মিক শাটডাউন ঘিরে নানা তত্ত্ব আবিষ্কার হচ্ছে।আড্ডার থিওরি মতে, দেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবিদের দিয়ে বিশেষ ন্যারেটিভ তৈরিতে বিশাল বাজেট এসেছে বাইরে থেকে। কোনো বিশেষ গ্রুপের মিডিয়ার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নে পরিকল্পনাও চলছে। কিন্তু ‘ট্যাগ’ লাগা মিডিয়ার তৈরি ন্যারেটিভ যে সমাজে কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারে না সেটাই বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(‘ট্যাগ খাওয়া’ মিডিয়া: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। সেন্ট্রাল রোড, ঢাকা)